ঢাকায় গণপরিবহনের যাত্রা শুরু মুড়ির টিন নামক বাস দিয়ে। মুড়ির টিন বাসের গল্প বা ইতিহাস হলো- ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ছয় বছর ধরে চলা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন শেষ হয়, তখন এতদঅঞ্চলে মিত্রবাহিনীর ব্যবহৃত কিছু যানবাহন এদেশের কিছু বিত্তশালীর কাছে নিলামে বিক্রি করে দেয়। সেসব যানবাহনের মধ্যে ছিলো- মালামাল পরিবহনের ট্রাক, জীপ গাড়ি, কাসিম বা কচ্ছপ আকৃতির টেক্সিসহ আরও অন্যান্য তাদের কিছু ব্যবহারিক ভাঙাচোরা গাড়ি। এসব ভাঙাচোরা গাড়ি তখনকার সময়ের বিত্তশালীরা ইংরেজদের কাছ থেকে কম দামে কিনে রাখে। ট্রাকগুলোর কাঠের বডিতে বাসের আদল দিয়ে তৈরি হয় নাকবোঁচা বাস। বাইরের দিকে কাঠের বডির ওপর মুড়ে দেওয়া হয় টিন। সেই থেকেই বাসটির নাম হয় মুড়ির টিন। আবার অনেকের মতে, মুড়ির মতো ভরাট হয়ে অধিক যাত্রী!!!
মুড়ির টিন বাসের ইতিহাস!
আমাদের দেশে সড়কপথে প্রথমদিকের গণপরিবহণ ছিল এই মুড়ির টিন বাস। বাসের নাম মুড়ির টিন হওয়ার পিছনে রয়েছে এক অদ্ভুত কারণ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আমাদের অঞ্চলের মিত্রবাহিনীদের ব্যবহার করা যানবাহন এদেশের বিত্তশালীদের কাছে বিক্রি করা হয়। এসব যানবাহনের মধ্যে ছিল ট্রাক,জিপ গাড়ি,ইত্যাদি। এগুলো ছাড়াও ভাঙ্গাচোরা কিছু গাড়িও বিক্রি করা হয়।
এগুলো গাড়ির ছিল কাঠের বডি। বিত্তশালীরা এসব কাঠের বডির গাড়িকে নাকবোঁচা বাসের আদলে মেরামত করতো। ইঞ্জিন আমদানি করা হতো যুক্তরাজ্য থেকে। অনেক সময় কাঠের বডি স্থানীয় মিস্ত্রীরাও তৈরি করতো। কাঠের বডির ওপরে মুড়ে দেয়া হতো টিন।
নৌকার ছাউনির মতো করে বাসের ওপরে টিনের ছাউনি দেয়া হতো, যেন বৃষ্টি এলে যাত্রীরা ভিজে না যায়। বাসের ভেতরে চারধারে বেঞ্চের মতো করে সিট বসানো হতো।
২০-২২ জন বসার সুযোগ পেত। ৫০ জনের বেশি যাত্রী দাঁড়িয়েই থাকত। জানালার পুরোটাই খোলা যেত বলে বাতাস চলাচলের সুযোগ ছিল বেশি। মূলত এ থেকেই বাসগুলোর নাম হয়ে যায় মুড়ির টিন বাস।
আবার অনেকে বলে বাসে মুড়ির মতো ঠেসে যাত্রী ঢোকানো হতো বলে এই বাসের নাম হয়ে যায় মুড়ির টিন।
এই মুড়ির টিন বাসগুলোকে স্টার্ট বাসও বলা হতো। একটি লোহার দন্ডের এক মাথা ইঞ্জিনে প্রবেশ করিয়ে জোরে ঘুড়িয়ে স্টার্ট দেয়া হতো বলেই এই নাম। পরে অবশ্য চাবি দিয়ে বাস চালুর ব্যবস্থা করা হয়।
…
মওলা বখশের হারিয়ে যাওয়া মুড়ির টিন,,
মওলা বখশ দূরদর্শী ছিলেন আর ছিলেন দক্ষ মেকানিক। তিনি একটি অকেজো বুইক গাড়ির ইঞ্জিন দিয়ে বানিয়ে নিয়েছিলেন শখের লঞ্চ। কেরোসিন তেলে চলা ওই লঞ্চে করে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে শিকারে যেতেন তিনি। আজিম বখশ বলছিলেন, ‘ত্রিশের দশকে বাবার (মওলা বখশ) একটি মোটর সাইকেল ছিল। এটি ছিল ঢাকার দুটি মোটর সাইকেলের একটি। অন্যটি ছিল ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেটের। বাবা কলকাতা যাওয়ার সময় মোটর সাইকেলের বিভিন্ন অংশ খুলে একটি বস্তায় ভরে ট্রেনে উঠতেন। শিয়ালদহে নেমে কাছের একটি মাঠে বসে আবার যন্ত্রাংশগুলো জুড়ে নিতেন। কলকাতায় যতদিন থাকতেন ওই মোটর সাইকেলে করেই ঘুরতেন।’
মাওলা বখ্শের মুড়ির টিন।
লক্কড়ঝক্কড় বাস দেখলে প্রায়ই বলতে শোনা যায়-এ তো দেখি মুড়ির টিন। কণ্ঠে থাকে তাচ্ছিল্যের সুর। সে যতই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করি এ ‘মুড়ির টিন’ নামটির সঙ্গে মিশে আছে নগর ঢাকার বাস সার্ভিস তথা গণপরিবহনের সূচনাপর্ব। ‘মুড়ির টিন’ নামে পরিচিত ঢাকার প্রথম দিকের বাস সার্ভিসটি শুধু ঢাকার নয়, বাংলাদেশের পরিবহন ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। ঢাকায় বাস সার্ভিস শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। বিশেষ করে ঢাকার ভেতরে পরিবহনব্যবস্থা সহজতর করতে এর তুলনা ছিল না। আর যার হাত ধরে ঘটনাটি ঘটেছিল তিনি তৎকালীন ঢাকার পঞ্চায়েত সরদার পেয়ার বখ্শের ছেলে মাওলা বখ্শ।
বাসগুলোকে মুড়ির টিন বলা হতো এর আকৃতি ও মানের কারণে। সাধারণত ট্রাকের কাঠামোর ওপর বসানো হতো এবং কোনো ধরনের আরাম-আয়েশের সুযোগ ছিল না। আকারে ছিল বেশ ছোট এবং সরু, দেখতে অনেকটা মুড়ি রাখার টিনের মতো। যাত্রীদেরও বসতে হতো খুব গাদাগাদি করে। গাড়ির ভেতর ও বাইরের এমনি চেহারার কারণেই রসিক ঢাকাবাসী মজার এ নামটি দিয়েছিল। কম পয়সায় ঢাকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সহজে যাতায়াতের সুযোগ করে দেওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুয়ের কাছে খুব দ্রুতই জনপ্রিয়তা পায় এ বাস সার্ভিসটি। স্থান করে নেয় ঢাকার নাগরিক জীবনের অংশ হিসেবে।