অরফিয়াস অ্যান্ড ইরিডাইসঃ এটিও একটি গ্রীক মিথ। সাহিত্যে তাঁদের কাহিনীকে স্বীকৃত দেয়া হয়, “tale of desperate love” বলে। গ্রীক পুরাণ মতে, স্বর্গের এক বিবাহিত পরী ইরিডাইসের প্রেমে পড়েন হারপুন নামক এক বাদ্যবাজক অরফিয়াস। কিন্তু দেবতা এরিসটেইয়াসের সাথে এই দুর্ঘটনায় অরফিয়াস, ইরিডাইসকে হারিয়ে ফেলে। তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়াহয় পাতালপুরীতে। কিন্তু অরফিয়াস তাঁর জাদুকরীএক বাদ্য মূর্ছনায় হারপুন বাজিয়ে দেব- দেবীর মন জয় করে ফেলে। তিনি তাঁর রাজ্য ফেলে ক্রমাগত হারপুনবাজিয়ে তাঁর ভালোবাসা ইরিডাইসের জন্য নানা জায়গায় অপেক্ষা করেছেন। অবশেষে সঙ্গীত দেবতা হেডস ও পারসিফোনের ক্ষমায় অরফিয়াস পাতালপুরীতে জান ইরিডাইসকে উদ্ধার করতে। কিন্তু শর্ত থাকে যে, অরফিয়াস পৃথিবীতে অবতরণের আগে ইরিডাইসকে পিছন ফিরে দেখতে পারবেন না। কিন্তু অরফিয়াস অতি আবেগে আর উৎকণ্ঠায় দেবতাদের শর্তের কথা ভুলে যায়, এবং ইরিডাইসকে দেখতে থাকে। ফলাফল, চিরতরের জন্য ইরিডাইসকে হারিয়ে ফেলে। বলা হয়ে থাকে, এই যে প্রেম কিংবা বিরহে সঙ্গীত ও মিউজিক অনেক বড় ভূমিকা থাকে, সেটা নাকি অরফিয়াস আর ইরিডাইসের প্রেমকাহিনী থেকেই অনুপ্রাণিত হওয়া।
প্যারিস অ্যান্ড হেলেনঃ গ্রীক পুরাণের ফ্যাক্ট এবং ফিকশনের অপূর্ব এক সংমিশ্রণ হল, গ্রীকলেখক কালজয়ী হোমারের জগতবিখ্যাত এপিক “ইলিয়াড।” নাম করা সেই যুদ্ধের নাম হল, “Trojan War!” যে যুদ্ধে ধ্বংস হয়েছিল পুরো একটা শহর- ট্রয়! ইতিহাসে যা “war for Helen” কিংবা “Helen of troy”নামে বিখ্যাত। গ্রীক পুরাণ অনুযায়ী অনন্য এই সুন্দরী হেলেন ছিলেন, ট্রয় নগরীর পার্শ্ববর্তী, স্পার্টার রাজা মেনেলাসের স্ত্রী। ট্রয়ের ছোট রাজকুমার প্যারিস তাঁকে চুরি করে তাঁর রাজ্যে নিয়ে এসেছিলেন। এতেই বেঁধে গেল ১২ বছর ধরে চলা এক ঐতিহাসিক যুদ্ধ। স্পার্টার পক্ষে এই যুদ্ধে নেতৃত্বদেন রাজা এগামেমনন। এমনকি এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন গ্রীক দেব ও দেবীরা! ট্রয় রাজকুমার হেক্টর, প্যারিস, দেবতা অ্যাকিলিস, স্পার্টার রাজা মেনেলাস সহ অনেকেই নিহত হন। প্রেমের জন্য এত রক্তপাত আর ধ্বংস পৃথিবীর ইতিহাসে আর নেই।
ট্রিস্টান অ্যান্ড অ্যাইসোলেইডঃ অনন্য এই প্রেমের কথা আমরা জানতে পারি, মধ্য ইংরেজিয় শাসন আমলে। আয়ারল্যান্ডের রাজকুমারী ছিলেন অ্যাইসোলেইড, তিনি ছিলেন ক্রনওয়ালের রাজা মার্কের বাগদত্তা। তিনি রাজকুমারী অ্যাইসোলেইডকে নিজ রাজ্য ক্রনওয়ালে ফিরিয়ে আনার জন্য দায়িত্ব দিয়েছিলেন তাঁর ভাইয়ের ছেলে ট্রিস্টানকে। কিন্তু সেই ভ্রমণে ট্রিস্টান অ্যান্ড অ্যাইসোলেইড একে অপরের প্রেমে পড়ে যান। যদিও শেষ পর্যন্ত অ্যাইসোলেইড রাজা মার্ককেই বিয়ে করতে বাধ্য হন। কিন্তু তাঁদের প্রেমের কথা রাজ্যে গোপন থাকে না। রাজা মার্ক তাঁদের দুজনকেই মাফ করে দেন, এবং বিনিমিয়ে ট্রিস্টানকে রাজ্য ছেড়ে যেতে বাধ্য করেন। পরে ট্রিস্টান, অ্যাইসোলেইডের সাথে নামের মিল থাকার কারণে ইসেউল্ট নামক এক রমণীকে বিয়ে করেন। কিন্তু, তাঁর আত্মার পুরোটা জুড়ে ছিল অ্যাইসোলেইডের প্রতি প্রেম। এক পর্যায়ে ট্রিস্টান, অ্যাইসোলেইডের বিরহে গুরুতর অসুস্থ হয়ে যান। তিনি অ্যাইসোলেইডকে শেষবারের মতো দেখতে একটি জাহাজ পাঠান। তাঁর স্ত্রী ইসেউল্টকে বলেছিলেন, অ্যাইসোলেইড যদি আসে, জাহাজে যেন সাদা পতাকা লাগানো হয়। কিন্তু স্ত্রী ইসেউল্ট মিথ্যে বলে, জাহাজে কালো পাতাকা লাগিয়ে রাখেন। ট্রিস্টান ভাবলেন অ্যাইসোলেইড আর আসবেন না। পরে তিনি মারা যান। পরে তাঁর শোকে অ্যাইসোলেইড, তাঁরই রাজ্যে মারা যান।
ল্যাঞ্ছলট অ্যান্ড গুইনেভারাঃ আরেকটি রাজকীয় এবং সেই সঙ্গে ট্র্যাজিক লাভ স্টোরি গুলোর মধ্যে অন্যতম হল, এই আর্থারিয়ান প্রেম কাহিনী স্যার ল্যাঞ্ছলট অ্যান্ড লেডী গুইনেভারা। ইংলিশ কিং আর্থারের স্ত্রী, রাণী গুইনেভারার প্রেমে পড়েছিলেন সেই রাজ্যের বীর একজন নাইট, স্যার ল্যাঞ্ছলট। রাজা আর্থারের অবহেলা আর অবজ্ঞার কারণে, একসময় রাণী গুইনেভারাও তাঁর প্রেমে পড়ে যায়। কিন্তু একদিন, রাজা আর্থারের অপর নাইট স্যার আগ্রাভেইন, স্যার মোড্রেড এবং একদল সৈন্য এই যুগলকে বদ্ধ কামরায় আবিষ্কার করে ফেলে। পরকীয়ার অপরাধে রাণী গুইনেভারাকে আগুনে পুড়িয়ে মারার শাস্তি ঘোষণা করা হয়। স্যার ল্যাঞ্ছলট তাঁর প্রেমিকা লেডী গুইনেভারাকে যুদ্ধ করে বাঁচিয়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়, কিন্তু তাঁদের এই প্রেমের জন্য পুরো রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং অনেক মৃত্যুর জন্য তাঁরা নিজেদের দায়ী করে, নিজেদের মধ্যে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তীতে তাঁরা দুজনেই দুটি ভিন্ন জায়গায় ধর্মের সেবক হয়ে যান।
এন্টোনি অ্যান্ড ক্লিওপার্টাঃ অনেকের মধ্যে অন্যতম আরেকটি অমর প্রেমগাঁথার নাম, মার্ক এন্টোনি- ক্লিওপার্টা। ঐতিহাসিক এবং একই সাথে দারুণ নাটকীয় এই প্রেম হয়, অনিন্দ সুন্দরী মিসরীয় রাণী ক্লিওপার্টা আর তাঁর প্রধান সেনাপতি এন্টোনির মাঝে। শক্তিশালী এবং ঐতিহাসিক চরিত্র দুটির মাঝের এই অমর প্রেম আকর্ষণীয়ভাবে আমাদের কাছে তুলে এনেছিলেন Shakespeare তাঁর যাদুকরী লিখনির মাধ্যমে। রাজকীয় ঘাত-প্রতিঘাত, জয়-পরাজয় উপেক্ষা করে তাঁরা বিয়ে করেছিলেন। পরবর্তীতে রোমানদের সাথে যুদ্ধরত এন্টোনির মনোবল ভাঙার জন্য, তাঁকে যুদ্ধের ময়দানে মিথ্যে সংবাদ শুনিয়েছিলেন যে, শত্রুরা ক্লিওপার্টাকে হত্যা করেছে। তারপর এন্টোনি নিজ ছুরিতে মৃত্যুবরণ করেন, অন্যদিকে এন্টোনির মৃত্যুসংবাদ শুনে মিসরীয় রাণী ক্লিওপার্টাও নিজ ছুরিতে আত্মহত্যা করেন। Shakespeare তাঁদের জন্য বলেছিলেন, “great love demands great sacrifices!”
রোমিও এবং জুলিয়েটঃ"Never was a story of love nor woe that of Juliet and her Romeo." সবাই-ই মেনে থাকেন এই জুটিই, প্রেমের ইতিহাস বা গল্পগুলোর মধ্যে সর্বাধিক প্রচারিত বা সবচেয়ে বেশী বিখ্যাত। যেন ভালোবাসার অপর নাম রোমিও-জুলিয়েট। বিশ্ববিখ্যাত ইংরেজ লেখক, William Shakespeare এর কালজয়ী ট্রাজেডি হল এই “Romeo and Juliet!” দুটি ভিন্ন পরিবারের পূর্ববর্তী রেষারেষি, বংশীয় অহংকার ভেদ করে দুজন তরুণ-তরুণীর প্রথম দর্শনে প্রেমে পড়া। পরবর্তীতে পরিবারের বাঁধা, ভয় দেখানো, নানা মানসিক সংশয়- টানাপোড়ন সব উপেক্ষা করে নানা নাটকীয়তার মাঝে তাদের বিয়ে করা। এবং সবশেষে, তথ্যগত ভুল বোঝাবুঝিজনিত কারণে বিষপানে দুজনের মৃত্যু!! সব মিলিয়েই, রোমিও- জুলিয়েট কাহিনী হয়ে গেছে অমর এক প্রেম গাথা! তাই পৃথিবীতে যখনই প্রেমের জন্য ত্যাগ- তিতিক্ষার কথা বলা হয়, সবার আগেই উঠে আসে এই যুগলের নাম! যুগে যুগে অসংখ্য নাটক, সিনেমা বানানো হয়েছে এই “timeless love” নিয়ে।
“কাকা, ফুচকায় আর একটু ঝাল দাও তো”- বলেই হাপুস হুপুস করে চোখ নাক মুছে আবার ফুচকাটা মুখে পুরল উদিতা ।
“ঝাল খেতে গিয়ে নাকের জল, চোখের জল এক হচ্ছে তবু খাওয়া চাই”- বলেই উদিতাকে ভালবেসেই দু ঘা বসাল রাহুল ।
উদিতা , রাহুলের কথায় বিশেষ কান না দিয়ে খাওয়ায় মনোনিবেশ করল । খাওয়া শেষে ফাউ নিয়ে খানিক তর্ক বিতর্কও হলো, তারপর হাঁটা লাগল দুজন ।
রাহুল আর উদিতার এই হেদুয়া পার্কের পাশ দিয়ে হাঁটাটা নতুন কিছু নয়, দীর্ঘ বেশ কয়েক বছরের অভ্যাস, বহুদিন ধরেই এই রাস্তা, দোকান, পার্কের বসার বেদি, ফুচকাওয়ালা, কৃষ্ঞচূড়া গাছটা এরা সবাই ওদের চেনে । ঐ যেদিন রাহুল প্রথম উদিতার হাত ধরেছিল, রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতেই, আচমকা, সেদিন উদিতার সাথে সাথে লাল কৃষ্ঞচূড়াটাও লজ্জা পেয়েছিল, রাঙা হয়েছিল উদিতার কানের লতি, গালের লালাভ আভা সেদিন রাহুলের চোখ এড়ায়নি ।
অথচ, এই রাহুল আর উদিতাই কোনদিন ভাবেনি, ওদের সম্পর্কটা এতদূর গড়াবে । শুধু ওরা না, কেউই ভাবেনি । কি করে ভাবতো? দুই মেরুর দুই মানুষ একে অপরকে এতটা ভালবাসতে পারবে কোনদিন ওরা নিজেরাই ভেবেছিল?
সেই যেবার হায়ার স্টাডিজের জন্য রাহুল অনেকটা দূরে চলে গেল, রাহুলকে প্রথমে কিছু না বললেও, নিঃশব্দে, আড়ালে কম চোখের জল ফেলেছিল উদিতা ? যা কোনদিন স্বপ্নেও ভাবেনি তাই হয়েছে , বুঝতেই পারেনি রাহুলকে কখন এতটা আপন করে নিয়েছে । ওদের রাতজাগা প্রতিটি কথোপকথন, খুব চেনা কফিশপটা, কলেজের গেটটা, টিউশন ব্যাচের চক ডাস্টার ব্ল্যাকবোর্ড ওদের বেড়ে ওঠা এই প্রেমের সাক্ষী ।
আনমনে দুজনে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এসব কথাই বারবার মনে আসছিল দুজনের ।
-“আচ্ছা, তোর মনে আছে, এই দোকানটার লস্যি তোর কত প্রিয় ছিল?”
-“হ্যাঁ, এই দ্যাখ, সেবার পুজোয় এই দোকানটাতেই খেয়েছিলাম না ? কি খারাপ ছিল বল ।।।।”
এসব বলতে বলতেই ট্রামলাইন পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে দুজন । আজ কতদিন পর আবার সেই চেনা রাস্তা, চেনা গলি, যেন অনেক না পাওয়ার মাঝে অনেকটা ফিরে পাওয়া ।
“আচ্ছা শোন, আজ তোকে কয়েকটা জরুরী কথা বলতেই এখানে ডাকা ।” রাহুলের দিকে তাকিয়েই বলল উদিতা ।
রাহুল জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে উদিতা আবার বলল, দ্যাখ, অনেকগুলো বছর অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে বাড়ির সকলকে আটকে রেখেছি, এভাবে আর কতদিন? আমার বাড়ির লোকজন কিন্তু এবার সিরিয়াস আমার বিয়ে নিয়ে।।।।।” কথাটা আর শেষ করতে পারল না উদিতা ।
খুব চেনা পরিচিত ভালবাসার গল্প এটা, আমাদের সবার মতোই ।
রাহুলের বাবা রিটায়ার করেছেন আগের বছর, সরকারী কেরানি ছিলেন, বাড়ির অবস্থা নিতান্তই সাধারণ । সেই বাড়ি থেকে ঘুঁষ দিয়ে সরকারী চাকরি লাভ বা বহু টাকার বিনিময়ে পড়াশুনো কোনটাই সম্ভব নয় । সুতরাং, এই মন্দার বাজারে যা চাকরীর অবস্থা এতে এসব নতুন কিছু নয়, কত প্রেমই তো এই চাকরীর অভাবে – টাকার অভাবে জানলা দিয়ে পালায় ।
রাহুলও শুনলো শুধু চুপ করে, একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছুই শোনা গেল না, উদিতা জানে রাহুলও যথেষ্ট চেষ্টা করছে, কিন্তু তাও এখনও অবধি।।।।।
দুইপক্ষের মৌনতায় যেন অনেকগুলো কথা বলে দিচ্ছিল, যে হাতদুটো একে অপরকে সবসময় আঁকড়ে রাখতে চেয়েছিল, আজ সেই হাতদুটোই কী ক্লান্ত? কে জানে।
“তুই আমার স্বপ্ন, আমার জীবনের ইচ্ছা সবই তো জানিস।।।।।”
রাহুলের মুখের কথা কেড়ে উদিতা বলল,”জানি, সবই জানি, ইনফ্যাক্ট আমিই সবথেকে ভাল জানি, কিন্তু, বাড়িতে কী বোঝাব বল তো? রোজ রোজ কী বলে বোঝাব? কী অজুহাত দেব?”
-“অজুহাত? অজুহাতটা কীসের? সবটা বুঝিয়ে বললে তাদেরও তো বোঝা উচিত? তার জন্য রোজ অজুহাতের কথা কী করে আসছে? তাও তো আমি চেষ্টা করছি ।” এটুকু বলেই থামল রাহুল । ফিরে তাকাল উদিতার দিকে, শক্ত করে ধরে রাখা হাত টার দিকে তাকাল একবার ।
উদিতা তাকিয়ে সেই চোখগুলোর দিকে, যেগুলোর দিকে তাকিয়ে আজ এতগুলো বছর বেঁচে থাকার রসদ পেয়েছে ও । রাহুলের স্বপ্ন, ওর লেখা এগুলো তো উদিতারও স্বপ্ন ছিল, ওকে জিততে দেখাটা তো উদিতারও স্বপ্ন ছিল, কিন্তু, সমাজ আর সেই সমাজের মানুষ থুড়ি জীব-এর সাথে পাল্লা দিয়ে চলতে চলতে আজ উদিতারও কোথাও যেন রাহুলের জন্য অপেক্ষাটা বিরক্তিকর ঠেকছে । রাহুলের নিজের স্বপ্নকে ছোঁয়াটা আজ উদিতার কাছে কিছুটা হলেও পাগলামো ঠেকছে, যেন, ওসব পরে হবে, চাকরিটাই জরুরী, স্বপ্ন ছোঁয়া চাট্টিখানি কথা নয়, ওসব ভেবে সময় নষ্ট করে কী লাভ?
************
দিন দিন কথার ওপর কথা বাড়ছিল, তার সাথে বাড়ছিল দূরত্ব । দুই পরিবারের ইচ্ছার চাপে, ওদের মিষ্টি সতেজ নিষ্পাপ প্রেম দীর্ঘশ্বাস ফেলছিল, কী করে যেন হারিয়ে যাচ্ছিল সবটুকু, অথচ রাহুল কিছুতেই মনঃসংযোগ করতে পারছিল না, চাকরিটাও জুটছিল না, কোনদিন ১০টা -৫টা অফিসের কাজের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরতে হবে স্বপ্নেও ভাবেনি, কিন্তু সবকিছু পেরিয়ে ভালবাসাটা যেন আর বেঁচে থাকছে না ।
-“দ্যাখ, আমার পক্ষে এভাবে আর সম্ভব হচ্ছে না, আমার মা বাবারও তো আমা
পরমা যেদিন ইন্টারভিউ দিতে জড়সড় পায়ে দুরুদুরু বুকে আবিরের উল্টোদিকের চেয়ারে বসে অজান্তেই ওড়নার শেষ প্রান্তটা দুহাতের তর্জনী দিয়ে গোল পাকাচ্ছিল আর "মাই নেম ইস পরমা চ্যাটার্জী" বলে ইন্ট্রোডাকশন দিচ্ছিলো, সেদিন কি জানতো এই আবির রায় ওর জীবনের একটা বড় অধ্যায় হয়ে দাঁড়াবে! প্রায় বছর তিন আগের সেই ইন্টারভিউ, আবিরের টিমেই জয়েন করা, একবছরের ট্রেনিং পিরিয়ড শেষ হবার আগেই কনফার্মেশন পাওয়া অবধি পরমার কাছে আবির রায় ছিলেন শুধুই "স্যার"। এর পর কেমন করে জানি "স্যার" থেকে বছর আটেকের বড় আবির হয়ে গেছিল "আবিরদা", আর গত দোলের পর থেকে আরও কাছের একজন!
রং, আবির, দোল... এসবই যেন পরমার কাছে ছিল আতঙ্ক, সেই আট বছর বয়স থেকেই, সেই যেবার রন্টিদা রং মাখানোর নাম করে অসভ্যতামি করলো... সারা দুপুর পেরিয়ে সারারাত শুধু ছটফট করলো বিছানায় ও... মা কে হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে সব কিছু বলার পরেও মা বললো "ও তোর পিসতুতো দাদা রমা। এসব কথা জানাজানি হলে কেলেঙ্কারি ঘটবে। তুই বরং শুয়ে থাক চুপ করে, আমি গরমজল নিয়ে আসছি"... সেই শেষ বার পরমার রং খেলা। এর পর প্রায় গত সতেরোটা বছর দোল মানেই পরমা কাটিয়েছে একরাশ ঘৃণা ভরে দরজার ছিটকিনি তুলে নিজেকে বন্দি করে। ফলে, গতবছর যখন দোলের আগের দিন অফিসের করিডরে লাঞ্চের পর থেকেই আবির খেলা শুরু হলো, আতঙ্কিত পরমা ঢাল হিসেবে পেয়েছিল অবিরদাকেই। কিছু বলতেও হয়নি। পরমার চোখ-মুখের পরিবর্তনই হয়তো আবিরকে কিছু বুঝিয়ে দিয়েছিল সেদিন। ফলে মিটিংয়ের নাম করে সেই যে পরমাকে মিটিং রুমে নিয়ে ঢোকে, দুজনে বেরোয় যখন, তখন প্রায় সন্ধ্যে। সেই লেট আওয়ারেও, টিমের কেউ কেউ রং মেখে প্রায় ভুত হয়ে পরমার দিকে তাক করতেই আবিরের গুরুগম্ভীর গলায় বারণ - "এই, ওকে কেউ রং দেবেনা, ওর সিভিয়ার এলার্জি আছে" শুনে কেউ একটা রঙের টিপ পর্যন্ত পড়ায়নি পরমার কপালে। নিজে অবশ্য সাদা শার্ট রঙিন করতে বাধা দেয়নি।
প্রথমবার বাড়ি অবধি গাড়ি করে ছেড়ে দিয়ে যাবার সময় এক কাপ চা পর্যন্ত অফার করে ওঠা হয়নি সেদিন মানুষটাকে। তবে সেই দিনের পর থেকেই একটা অদ্ভুত অনুভূতি রাঙিয়ে দিয়ে গেছিল পরমার মনটাকে। অফিস যাওয়াটা, আবিরের সঙ্গে দেখা হওয়া, কথা বলা, সময় কাটানোটা যেন একটা ভালোলাগার জায়গায় পৌঁছে গেছিল। সূক্ষ্ম হতে শুরু করেছিল ভালোলাগা আর ভালোবাসার দূরত্ব!
অফিসের বাইরেও বাড়তে থাকে দুজনের সময় কাটানো, ঘনিষ্ঠতা। আদান-প্রদান চলতে থাকে চিন্তা, ভাবনা, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। এর মধ্যে অফিসেও কানাঘুষো উঠেছে দুজনের মধ্যে এই সম্পর্কের ব্যাপারে কথাবার্তা। দুই বাড়ির লোকজন যখন দুজনের বিয়ের ব্যাপারেই উঠে পরে লাগেন, তখনই দুজনে নিয়ে ফেলে জীবনের চরম ডিসিশন... এক সঙ্গে পথ চলার সিদ্ধান্ত। আর আশ্চর্য ভাবে দিনটা সেই দোলের আগের দিন! এবারে অবশ্য দুজনেই অফিস যায়নি। ছুটি নিয়ে সারাটা দিন কাটিয়েছে নন্দনে। রাতে বাড়ি ছেড়ে দিয়ে যাবার আগে চায়ের কথা বললেও, ভেতরে আসেনি আবির। সামনের রবিবার তো আসবেই বাবা মাকে সঙ্গে নিয়ে। বরং কখন কিনেছে জানতোই না পরমা... একটা ছোট্ট প্লাসটিকের প্যাকেট থেকে একচিমটে লাল আবির নিয়ে পরমার দুগালে লাগিয়ে দিল আবির। একটু-আধটু লাল রং ছড়িয়ে পড়লো পরমার সাদা ওড়নায়। কিচ্ছুটি বললো না পরমা... বাধা দেওয়াতো দূরে থাক, জীবনে প্রথমবার যেন উপলব্ধি করছে আবিরের গন্ধটা! আবিরের আঙ্গুল ছুঁয়ে গাল ভেদ করে যেন সারা শরীরে রক্তের মতো ছড়িয়ে পড়ছে সেই উষ্ণ আবির আজ পরমার! টলতে টলতে বাড়ি ঢুকে জামা-কাপড় না বদলেই শুয়ে পড়লো ও। শুয়েই রইলো ফোনটা না আসা অবধি।
আবিরের বাড়ি থেকে ফোন। এক্সপ্রেস ওয়েতে গাড়িটা অ্যাক্সিডেন্ট করেছে আবিরের।
কেটে গেছে পাঁচটা বছর। সেই কম্পানি ছেড়ে নতুন অফিসে জয়েন করেছে পরমা, তাও বছর চারেক হয়ে গেল। প্রমোশন পেয়ে পরমা এখন ম্যানেজার। ইন্টারভিউ নেওয়ার আগে শর্টলিস্টেড তিনজন ক্যান্ডিডেটের সিভি গুলো একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়ার জন্য প্রিন্ট আউট হাতে নিতেই বুকটা ধক করে উঠলো ওর। প্রথম ছেলেটার নামই আবির রায়। বয়স পঁচিশ। সদ্য মাস্টার্স শেষ করে চাকরি করতে আসছে।
যথারীতি ঠান্ডা ঘরে টেবিলের ওপ্রান্তে বসে ইন্টারভিউ দেওয়াকালীন ঘামলো আবির। হয়তো নিজস্ব টেনশনে খেয়াল করেনি, টেবিলের এপ্রান্তের যিনি ইন্টারভিউ নিচ্ছেন, তারও কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, মাঝে মাঝেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছেন ম্যাডাম।
ইন্টারভিউ শেষ করেই ওয়াশরুমে গিয়ে হাউ হাউ করে অনেকটা কাঁদলো পরমা। বেশ অনেক্ষণ সময় নিয়ে কিউবিকলে ফিরেই কয়েকটা মেল চেক করে আর পাঠিয়ে কাঁধে ব্যাগটা তুলে নিল ও। পাশের টেবিল থেকে ব্রততী ততক্ষণে চিমটি কেটে দিয়েছে একটা "ও, কাল হোলি, ম্যাডামতো আজ আর্লি লিভ নেবেই। কেন যে তুই ব্যাপারটা এনজয় করিস না..."!
বাড়ি ফিরে সন্ধ্যেবেলা এককাপ চা নিয়ে অন্য দিনের মতোই খাটের পাশে এসে বসলো পরমা। বলে চলেছে আজকের অফিসের অভিজ্ঞতা। অন্যদিনের মতোই পরমার কথার কোনো জবাব না দিয়ে শুধু তার দিকে তাকিয়ে থাকে আবির। সেই কার অ্যাক